দেশে বাড়ছে নারীর প্রতি সহিংসতা: বিচারহীনতাকে দায়ী করলেন মানবাধিকারকর্মীরা
- ডেস্ক রিপোর্ট:
- 13 Sep, 2026
সাম্প্রতিক সময়ে বাংলাদেশে নারীর প্রতি সহিংসতা, পারিবারিক নির্যাতন, ধর্ষণ এবং খুনের ঘটনাগুলো এক ভয়াবহ ও জটিল রূপ ধারণ করেছে।
বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা, জাতীয় জরুরি সেবা এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, মোট অপরাধের সংখ্যায় কখনো কখনো সামান্য তারতম্য ঘটলেও নির্যাতনের ধরন আগের চেয়ে অনেক বেশি নৃশংস হয়েছে। বিশেষ করে নারীদের জন্য সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল হিসেবে বিবেচিত নিজের ঘরই এখন পরিণত হয়েছে মৃত্যুফাঁদে।
পারিবারিক সহিংসতাকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়ার সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি এবং বিচারহীনতার সংস্কৃতির কারণে অপরাধীরা দিন দিন আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এর সাম্প্রতিক পরিসংখ্যান নারী নির্যাতনের এক উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরে।
চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট মাস পর্যন্ত নারী নির্যাতনের নানা অভিযোগে মোট ২৭ হাজার ৯১১টি কল এসেছে, যার মধ্যে প্রায় ৬২ শতাংশ বা ১৭ হাজার ১৯৬টি অভিযোগই ছিল স্বামীর বিরুদ্ধে। অর্থাৎ, প্রতিদিন গড়ে অন্তত ৭০ জন নারী স্বামীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়ে সাহায্য চেয়েছেন, যা গত বছরের ৫৮ শতাংশের তুলনায় উল্লেখযোগ্য মাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে।
এর পাশাপাশি বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো (বিবিএস) ও ইউএনএফপিএ-এর ‘নারীর প্রতি সহিংসতা জরিপ ২০২৪’-এর তথ্যমতে, দেশের প্রায় ৭০ শতাংশ নারী তাঁদের জীবদ্দশায় অন্তত একবার হলেও জীবনসঙ্গী বা স্বামীর হাতে শারীরিক, মানসিক, যৌন বা অর্থনৈতিক সহিংসতার শিকার হয়েছেন। এর মধ্যে ৪১ শতাংশ নারী জরিপকালীন সময়ের আগের এক বছরের মধ্যেই নির্যাতনের শিকার হয়েছেন, যা পারিবারিক কাঠামোর অভ্যন্তরে নারীদের চরম নিরাপত্তাহীনতার প্রমাণ।
পারিবারিক নির্যাতনের এই ধারা অনেক ক্ষেত্রেই মর্মান্তিক হত্যাকাণ্ডে রূপ নিচ্ছে। আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম আট মাসে পারিবারিক সহিংসতার ২৮৪টি খবর গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। এর মধ্যে ১০৮ জন নারীই স্বামীর হাতে খুন হয়েছেন এবং ২২ জন মারাত্মক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন।
আল মাইদা আক্তার বা মুক্তা ইসলামের মতো ভুক্তভোগীদের ঘটনাগুলো প্রমাণ করে যে, মাসের পর মাস শারীরিক নির্যাতন সহ্য করার পর শেষ পর্যন্ত তাঁদের হত্যা করে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে আত্মহত্যার নাটক সাজানোর অপচেষ্টা করা হয়। ২৮৪টি ঘটনার মধ্যে মাত্র ১১৯টি ক্ষেত্রে মামলা দায়ের হওয়ার বিষয়টি স্পষ্ট করে যে, সন্তানের ভবিষ্যৎ বা সামাজিক লজ্জার ভয়ে অধিকাংশ ঘটনাই আইনের আওতার বাইরে থেকে যাচ্ছে।
পারিবারিক পরিসরের বাইরেও ধর্ষণ, অপহরণ এবং আত্মহত্যার মতো ঘটনাগুলো সমাজে গভীর ক্ষত তৈরি করছে। মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের (এমএসএফ) প্রতিবেদন অনুযায়ী, এক মাসের ব্যবধানে মোট অপরাধের সংখ্যা কিছুটা কমলেও নির্দিষ্ট কিছু ভয়াবহ অপরাধের মাত্রা অস্বাভাবিক হারে বেড়েছে। যেমন, জুন মাসের তুলনায় জুলাই মাসে ধর্ষণের ঘটনা প্রায় ৩৩ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ৬৮টি থেকে ৯০টিতে দাঁড়িয়েছে। একই সময়ে আত্মহত্যার ঘটনা ১৭টি থেকে প্রায় ৬৫ শতাংশ বেড়ে ২৮টিতে উন্নীত হয়েছে।
বিচারহীনতার মানসিক প্রতিক্রিয়া এবং সামাজিক নিপীড়নই মূলত আত্মহত্যার এই উচ্চ হারের প্রধান কারণ বলে মনে করছেন মানবাধিকারকর্মীরা। যদিও দলবদ্ধ ধর্ষণ, শারীরিক নির্যাতন এবং নারী ও শিশু হত্যার মতো কিছু অপরাধের মাত্রা সামান্য কমেছে, তবুও অপহরণ ও নিখোঁজের ঘটনা বৃদ্ধি পাওয়ায় সার্বিক পরিস্থিতি চরম উদ্বেগজনক।
বিচারব্যবস্থার দুর্বলতা এবং সমাজের নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি এই পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। আইন অমান্য করে গ্রাম্য সালিসের মাধ্যমে ধর্ষণচেষ্টা বা বলাৎকারের মতো গুরুতর ফৌজদারি অপরাধ মীমাংসা করার প্রবণতা অপরাধীদের দায়মুক্তির সংস্কৃতিকে আরও দৃঢ় করছে।
এছাড়া পরিত্যক্ত অবস্থায় নবজাতক উদ্ধারের ঘটনাগুলোও সামাজিক অবক্ষয়ের ইঙ্গিত দেয়।
নারী অধিকারকর্মীদের মতে, পারিবারিক সহিংসতাকে অপরাধ হিসেবে গণ্য না করে মানিয়ে নেওয়ার যে সংস্কৃতি সমাজে প্রচলিত, তা অবিলম্বে ভাঙতে হবে।
শুধুমাত্র আইনের সংস্কার নয়, বরং রাষ্ট্রের ‘শূন্য সহিষ্ণুতা’ নীতি গ্রহণ এবং বিচারপ্রাপ্তি নিশ্চিত করার মাধ্যমেই নারীর প্রতি এই ক্রমবর্ধমান সহিংসতা প্রতিরোধ করা সম্ভব।
Leave a Reply
Your email address will not be published. Required fields are marked *

